• বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন

বিএনপির প্রধান সমস্যা দলের মধ্যে হাইব্রিডদের দৌরাত্ব

স্টাফ রিপোর্টার / ২৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬

দেড় যুগ ধরে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করে গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সফলতা পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুঃশাসনের সময় মামলার শিকার হন লাখ লাখ নেতাকর্মী। গুম-খুনের শিকার হন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু নেতা ছিলেন একেবারেই নিষ্ক্রিয়। কেউ করেছেন আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য আবার অনেকে দীর্ঘদিন ছিলেন বিদেশে।

এসব সুবিধাভোগী হাইব্রিড নেতা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এলাকা। থাকছেন বিএনপির মিছিল-মিটিংয়ের একেবারে সামনের সারিতে। তাদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীরা।

দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বিএনপির সুদিন ফিরে আসায় অনেক সুবিধাবাদী দলে ভিড়তে শুরু করেন। বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগের আনুকূল্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন কিংবা আন্দোলনের সময় নিরাপদে বিদেশে ছিলেন, তারাই এখন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছেন। হঠাৎ সামনে আসা এসব নেতাকর্মী বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছেন আগে বিএনপি করতেন, কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনকালে দলের সঙ্গে বেঈমানি করে আন্দোলন ও সংগ্রামে ছিলেন না।

বিগত সরকার থেকে নিয়েছেন নানা ধরনের সুবিধা। মামলা হামলায় পড়তে হয়নি গত দেড় দশকে। সরকারি সহায়তায় ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছেন। একসময়ের দাপুটে আওয়ামী শাসকদের সঙ্গে গ্রুপ ছবি, ভিডিও সবই আছে তাদের। এখন সেই নেতারাই আবার বিএনপি নেতা ও এমপিদের চারপাশে ঘুর ঘুর করছেন। বসন্তের কোকিল হয়ে আসা এসব নেতার জন্যই বিএনপিকে নানাভাবে ইমেজ সংকটে পড়তে হচ্ছে বলে দলের ত্যাগী নেতারা দাবি করছেন। তারা বলছেন, ১৭ বছর জেল জুলুমে পড়ে দলের অধিকাংশ নেতা সর্বস্বান্ত। তবে বসন্তের কোকিল হয়ে আসা লোকজন হঠাৎ রাজনীতিতে এসে অনেক টাকা পয়সা খরচ করছেন, দায়িত্বশীল নেতাদের কদর করে মনোযোগ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। এ নেতারাই নানাভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের নানা অবৈধ পন্থার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। জানা গেছে, পদধারী লোভী নেতাদের অপকর্মের কারণে দলকে বিপদে পড়তে হচ্ছে। অনেক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বিএনপির এমপির মুজিব কোর্ট পড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। যার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল।

ক্ষমতার দাপট, সাধারণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হঠাৎ লোভী হয়ে ওঠা এসব নেতার জন্য আগামী সাধারণ নির্বাচনে মানুষ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। আবার প্রতিপক্ষ কয়েকটি ইসলামী দলের আক্রমণাত্মক প্রচারও বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলছে। বিএনপি কতিপয় নেতাকর্মীর অপকর্ম বা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে দল হিসেবে বিএনপিকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপতথ্য ঠেকাতে দলের নেতাদের অনলাইন প্ল্যাটফরমে সোচ্চার হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অনেকেই অভিযোগ করেছেন আওয়ামী সরকারের দুঃশাসনের আমলে নির্বিঘ্নে চালিয়েছেন ব্যবসা বানিজ্য, নিয়েছেন নানা সুযোগ সুবিধা, সখ্য রেখে চলেছেন আওয়ামী নেতা, মন্ত্রী এমপিদের সঙ্গে। ৫ আগস্টের পর তারাই এখন ভোল পাল্টে হঠাৎ বড় বিএনপি হয়ে গেছেন।

দলীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে নেতাদের আশপাশে সর্বত্রই এখন তাদের দৌরাত্ম্য। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা বসন্তের কোকিল এসব হাইব্রিড বিএনপির প্রতাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে লড়াই সংগ্রামে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীরা ৫ আগস্টের পর শুধু বিএনপি নাম ধারণই নয়, দখল, টেন্ডার, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা, চাঁদাবাজিসহ জড়িয়ে পড়েছেন নানা অপকর্মে। যার দায় বহন করতে হচ্ছে বিএনপিকে। বসন্তের কোকিলদের এসব কর্মকাণ্ডে অনেকটা বিব্রত ও ক্রুদ্ধ দুঃসময়ে ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা।

দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দলীয় কার্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন সড়কের অলিগলিতে হাইব্রিজ নেতাদের ব্যানার, পোস্টার শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন নেতার বাসাবাড়ি কিংবা অফিসে এসব নেতার পদচারণাও বাড়ছে। ভিড় করছেন বিভিন্ন লবিং-তদবির নিয়ে। অন্যদিকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে যেসব নেতাকর্মী রাজপথে ছিলেন, মামলা হামলায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, ঘরছাড়া হয়েছেন, তারা এখন অনেকটা ‘অসহায়’।

হাইব্রিড নেতাদের চাপে তাদের অনেকেই এখন দলীয় কার্যালয়, নেতাদের বাসাবাড়ি এড়িয়ে চলছেন। অহেতুক মিথ্যা অভিযোগে বহিষ্কার আতঙ্ক নিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন অনেকে। বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন দলের অনেক নেতা মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আগের মত মূল্যায়ন করছেন না। নেতাদের এখন মূখ্য উদ্দেশ্য টাকা পয়সা কামিয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়া।

ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ের পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের ব্যবসা বানিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপির নেতা কর্মীরা।
ইউনিয়ন ও উপজেলা বিএনপির দৈন্যদশা ক্ষমতার একমাসেই দলের মূলধারার নেতাকর্মীরা ছিটকে পড়ছে। পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার দলের নেতৃবৃন্দ বিএনপির এমপি নেতাদের কাছে অনেকটা প্রিয় পাত্র হয়ে উঠছেন।

উপজেলা পর্যায়ের এক নেতা আক্ষেপ করে বলেন পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার দলের নেতৃবৃন্দ এখন বিএনপির দলীয় এমপিদের খুশি করতে ব্যস্ততায় আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে মুজিব কোর্ট পড়ে বিএনপির এমপিকে শুভেচ্ছা জানানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল।
বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মী এখন অনেকটা গা-ছাড়া ভাব নিয়ে চলছেন। কারণ এখন আন্দোলন সংগ্রাম, মিছিল সমাবেশ নেই তাই নেতাদের কাছে কর্মীদের মূল্যায়ন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নিবেদিত কর্মীরা যদি দলের প্রতি তাদের আস্তা বিশ্বাস হারায় তাহলে আগামী নির্বাচনে এর খেসারত দিতে হবে বিএনপিকে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category