• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৪৩ পূর্বাহ্ন

ভিজিএফের চাল আসলে যায় কার পেটে?

সাকিব আল হাসান নাহিদ / ৫২ Time View
Update : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

ঈদ উপলক্ষে ১০ কেজি ভিজিএফ চাল প্রকল্প কাগজে-কলমে এটি দরিদ্র মানুষের সহায়তা। কিন্তু বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকেই যায়, এই প্রকল্প আসলে কতটা কার্যকর? ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা। কিন্তু দেশের অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ঈদের আগের একটি পরিচিত দৃশ্য হলো ১০ কেজি ভিজিএফ চালের জন্য দীর্ঘ লাইন, অপেক্ষা, অনিয়ম আর হতাশা। বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, অথচ পরিবর্তন খুব একটা চোখে পড়ে না। প্রশ্ন উঠতেই পারেl এই প্রকল্প বাস্তবে কতটা কার্যকর?

সরকারের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভালো। দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঈদ উপলক্ষে ভিজিএফ চাল বিতরণ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে কাগজের হিসাবের বিস্তর ফারাক রয়েছে।

ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে পুরো ১০ কেজি চাল পান না। ৭-৮ কেজি দিয়েই শেষ হয়ে যায় বিতরণ। কেউ প্রতিবাদ করলে বলা হয়, “খাদ্য গুদাম থেকেই কম এসেছে।” আবার খাদ্য গুদামে অভিযোগ করলে শোনা যায়, “ওজন করেই দেওয়া হয়েছে, কম হওয়ার সুযোগ নেই।

এভাবেই দায়িত্ব এড়িয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে। কিন্তু মাঝখানে ঠকে যায় সেই মানুষগুলোই, যাদের জন্য এই সহায়তা। একজন দিনমজুরের কাছে সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানে একটি দিনের আয় হারানো। তার আগে স্লিপ সংগ্রহ করতে গিয়ে নষ্ট হয় আরেক দিনের অর্ধেক সময়। শেষ পর্যন্ত হিসাব মিলিয়ে অনেকেরই মনে হয় এই ভোগান্তির চেয়ে হয়তো দিনমজুরি দিলেই বেশি উপকার হতো।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো উপকারভোগীর তালিকা। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিলে প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়, তালিকার বড় একটি অংশ প্রকৃত দরিদ্র নয়। ১০০টি কার্ডের মধ্যে ৭০-৮০ জনই অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত পাওয়ার যোগ্য নন।

অনেকেই চাল না তুলে কার্ড বিক্রি করে দেন। পরে সেই চাল পাইকারদের হাত ঘুরে চালকল পর্যন্ত যায় এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে ফিরে আসে সাধারণ মানুষের খাবার হিসেবেই। অর্থাৎ, গরিব মানুষের জন্য দেওয়া সহায়তা শেষ পর্যন্ত একটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। লাভবান হয় অসাধু চক্র, অথচ প্রকৃত অসহায় মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে লাইনের শেষ প্রান্তে।

আবার এই কার্ড বণ্টনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতি, প্রভাব খাটানো, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দ্বন্দ্ব, এমনকি সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনাও ঘটে। যে প্রকল্প মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য, সেটিই অনেক জায়গায় বিরোধ আর বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সময় নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। ঈদের সহায়তা হিসেবে দেওয়া হলেও অনেক জায়গায় ঈদের মাত্র দুই-তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে চাল বিতরণ শুরু হয়। কোথাও আবার ঈদের পরেও বিতরণ চলতে দেখা যায়। তাহলে এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কী? মানুষের ঘরে ঈদের আগে স্বস্তি পৌঁছে দেওয়া, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা?
সবকিছু মিলিয়ে এখন সময় এসেছে এই প্রকল্প নিয়ে নতুন করে ভাবার।

হয় এটি সম্পূর্ণ সংস্কার করতে হবে, নয়তো বিকল্প কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত উপকারভোগী নির্ধারণ, ডিজিটাল যাচাই, স্বচ্ছ তদারকি এবং সঠিক ওজন নিশ্চিত করা ছাড়া এই প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। গরিব মানুষ দয়া চায় না।

তারা চায় সম্মানের সঙ্গে নিজের ন্যায্য অধিকারটুকু। রাষ্ট্রের সহায়তা যদি মানুষের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে এখনই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category