জামালপুরের ইসলামপুর সরকারি কলেজে বিধিবহির্ভূতভাবে জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বিএনপির ইসলামপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতির পদে দায়িত্বরত আছেন বলে জানা গেছে।
জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা, ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং সরকারি চাকরিজীবীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রশ্নে কলেজজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এতে শিক্ষার পরিবেশ কুলষিত হচ্ছে। অভিযোগের অভিযুক্ত শিক্ষক হলেন, একই কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ নূরে আলম মনি। তার বাড়ি ইসলামপুর উপজেলায়। তিনি বিএনপির বিএনপির প্রভাব খাটিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।
জামালপুর জেলা বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, তিনি ইসলামপুর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক রাজনৈতিক দলের পদধারী হতে পারেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে এবং তিনি চাকরির আচরণ বিধি লংঘন করেছেন। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধি মালা ১৯৭৯ এর বিধি ২৫ এর ১ উপবিধি অনুসারে সরকারি কোন কর্মচারী কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এখানেই বিধি লংঘন করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি কলেজ-৬ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মনজুরুল আলম স্বাক্ষরিত গত ১৮ মে’র এক আদেশে নূরে আলম মনিকে ইসলামপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরদিন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ এপ্রিল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আহাম্মদ আলী অন্যত্র বদলি হলে তিনি নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতম প্রভাষক মো. রুকন উদ্দিনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য পাঠানো জ্যেষ্ঠতার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা হয়েছে রাজনৈতিক দলের বিবেচনায় বলে শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন।
বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময় প্রতি উপজেলায় একটি করে কলেজ জাতীয়করণ করা হয়, সেই ক্যাটাগরিতে ধর্মমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দুলালের প্রচেষ্টায় কলেজটি সরকারি করণ করা হয়। তখন বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক মনি ছিল কোনঠাসা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নন-ক্যাডার শিক্ষকদের ২৪ সদস্যের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা তালিকায় নূরে আলম মনির অবস্থান ছিল ১৩তম কিন্তু বিএনপির প্রভাবে তিনি হয়ে গেলেন।
কোন প্রক্রিয়ায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য পাঠানো প্রস্তাবে তাঁকে প্রথম পাঁচজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সময় প্রকৃত জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অবস্থানও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠতার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মাহমুদা সুলতানাকে চতুর্থ, তৃতীয় অবস্থানে থাকা মো. মোরাদুজ্জামানকে দ্বিতীয় এবং ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা মিনাক্ষী প্রসাদ সাহাকে তৃতীয় স্থানে দেখিয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে গত ১২ মে বেসরকারি কলেজ-৬ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিব কাজী নূরুল ইসলাম মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নূরে আলম মনির প্রকৃত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করে মতামত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ মে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ-১ শাখার সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিউল বশর কলেজ কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। নোটিশে তিন কার্যদিবসের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার অমিলের কারণ ব্যাখ্যা এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মতামতসহ সংশোধিত তালিকা পাঠাতে বলা হয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখনো ওই নোটিশ কলেজে পৌঁছেনি। আদৌ পত্রটি কলেজ কর্তৃপক্ষ পাবে কি-না সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রভাষক মাহমুদা সুলতানা বলেন, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কীভাবে নূরে আলম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হলেন, তা বলতে পারছি না। আমি কোনো অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর করিনি। অষ্টম অবস্থানে থাকা প্রভাষক মোহাম্মদ আহসান হাবিব রাজা বলেন, “আমিও কোনো অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর করিনি। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বাদ দিয়ে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা বিধিসম্মত নয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নূরে আলম মনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। তাছাড়া এই পদের জন্য আমি কোন তদবির করি নাই। কর্তৃপক্ষ আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন আমি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছি।
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নবাব বলেন, নূরে আলম মনি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি পদে রয়েছেন। তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হয়েছে বলে শুনেছি।
প্রভাষক মো. রুকন উদ্দিন বলেন, দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার সময় তাড়াহুড়ার কারণে জ্যেষ্ঠতার বিষয়ে ভুল হয়েছিল। পরে তা সংশোধন করা হয়েছে। শোকজের বিষয়টি শুনেছি, তবে এখনো কোনো নোটিশ হাতে পাইনি। বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক আহাম্মদ আলী বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতম শিক্ষক রুকন উদ্দিনের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছি। এরপর কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে এবং রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষক সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে হবে অথবা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিতে হবে।
এদিকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের পদধারী একজন শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অসঙ্গতি ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা।