• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ন

অবহেলা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে চালু হয়নি জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ

স্টাফ রিপোর্টার / ৩১৮ Time View
Update : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

এক দশকের বেশি সময়েও চালু হয়নি জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের কোটি টাকার আইসিইউ। অযন্তে অবহেলায় এবং অব্যবস্থাপনায় কোটি টাকার ICU নষ্ট অকেজো হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালের নিরব অন্ধকার শেতসেতে কক্ষে। কার্যত্ব বন্দী দশায় নিভূর্ত দিনক্ষন পার করছে।

দক্ষ জনবলের অভাবে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে এক দশকের বেশি সময়ও চালু হয়নি কোটি টাকা মূল্যের চারটি আইসিইউ। এতে অকেজো হয়ে পড়েছে কোটি টাকা মূল্যের আইসিইউ গুলো। দেখার কেউ নেই।

জামালপুর ২৬ লাখ জনগনসহ শেরপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার কিছু অংশের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসাস্থল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল।

লাখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেই বছরের ৩১ জানুয়ারি কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ চার শয্যার আইসিইউ সেবা উদ্বোধন করে তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। কিন্তু এরপর কোনো দিনও চালু হয়নি সেই আইসিইউ। এতে ব্যাপক দুর্ভোগে পড়তে হয় এই অঞ্চলের সেবা প্রত্যাশীদের।

আইসিইউ সেবা না থাকায় গুরুতর রোগীদের দ্রুত ময়মনসিংহ বা রাজধানী ঢাকাতে পাঠাতে হচ্ছে। বেশিরভাগ সময় পথেই জীবন হারাচ্ছেন অনেক রোগী। এছাড়াও বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিতে গেলে খরচ করতে হয় লাখ লাখ টাকা।

১০ জুন জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়- মূল ভবনের দক্ষিণ পাশের ভবনটির তৃতীয় তলার দেয়ালে লেখা আইসিইউ। সেখানকার আইসিইউ এর কক্ষে তালা ঝুলছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কক্ষটি খুলে দেন সেখানকার দায়িত্বে থাকা পারুল ইসলাম। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়- এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যন্ত্রপাতি গুলো, দীর্ঘদিন ব্যবহার না করাই ভেতরে লাইট গুলোও নষ্ট হয়ে গেছে, বিছানা গুলোও ব্যবহারহীন। কোটি টাকার এই অবকাঠামো যেন শুধুই নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অব্যবস্থাপনার।

এসময় কথা হয় আইসিউ কক্ষের পরিষ্কার করার দায়িত্বে থাকা পারুল বেগমের সাথে। পারুল বেগম বলেন-“আমি প্রতিদিন আসি, তালা খুলে পরিষ্কার করে আবার রেখে দেই । আজ পর্যন্ত কোন রোগী এখানে আসে নাই ।

জেলার ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী ইউনিয়নের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন-“আমার মেয়ের সিজারের পর আমার মেয়ে ও তার সন্তানের জন্য আইসিইউ এর প্রয়োজন পড়ে। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও সেটি চালানো হয় না। তাই আমি তাদেরকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে অতিরিক্ত বিল হয় যা আমার পক্ষে দেওয়া খুবই কষ্টকর ছিলো শেষ পর্যন্ত আমার গহনা বিক্রি করে বিল পরিশোধ করি। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ চালু থাকলে চিন্তা করতে হতো না।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা তাজুল ইসলাম বলেন-“শুনেছি এখানে আইসিইউ উদ্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর চিকিৎসা পাইনি কেও, দেখা যায় চিকিৎসার জন্য ওই ময়মনসিংহ যেতে হয় আমাদের। এতো টাকার যন্ত্রপাতি উদ্বোধন করা হলো, ব্যবহার করা হলো না একদিন ও , এগুলো তো আমাদের টাকায় কেনা ছিলো। এর দায় এখন কে নিবে?

সদর উপজেলার বাসিন্দা মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, “২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে আমার বাবার হার্টে সমস্যা ধরা পড়ে। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নিতে বলে এবং জামালপুরে না থাকায় ময়মনসিংহে স্থানান্তর করে। কিন্তু ময়মনসিংহে নেয়ার পথেই আমার বাবা মারা যায়। জামালপুরে আইসিইউ সেবাটি চালু থাকলে হয়তো আমার বাবা মারা যেতো না।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের দীর্ঘদিনের অ্যাম্বুলেন্সচালক শফিকুল ইসলাম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “বহু বছর ধরে এই হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালাই। কত মুমূর্ষু রোগীকে ময়মনসিংহ আর ঢাকায় নিয়ে গেছি, তার হিসাব নেই। অনেক সময় রোগীর স্বজনরা কান্না করতে করতে গাড়িতে ওঠেন, আর পথেই মারা যায় প্রিয় মানুষটা। নিজের চোখের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর কত মৃত্যু দেখেছি, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু থাকলে হয়তো এভাবে এত মানুষকে পথেই মারা যেতে হতো না।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন-“স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতার কারনে আজ এই অবস্থা। যন্ত্রপাতি দিয়েছে কিন্তু দক্ষ জনবল দেয়নি। এমন উদাসীনতা আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা চাই জেলাবাসীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে।”

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ রনি জানান- আইসিইউ কক্ষের ভেতরে মোট চারটি শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি আইসিইউ ও দুটি উচ্চমাত্রার নির্ভরশীল (এইচডিইউ) শয্যা। প্রতিটি শয্যার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব আধুনিক যন্ত্রপাতি লাগানো রয়েছে। এই আইসিইউসহ পুরো সেবা চালু করতে কত টাকা খরচ হয়েছে সে সম্পর্কে হাসপাতালের কারোর ধারনা নেয়। ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: মো: মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন-“বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালে ঢাকা থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আইসিইউ গুলোকে অকেজো বা বাতিল বলে ঘোষনা করেছে।

ফ্যাসিবাদের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা: মাহফুজুর রহমান বিএনপি আমলেও বহাল তবিয়তে বিভিন্ন ভাবে ম্যানেজ করে স্বপদে এখনো বহাল আছেন। মূলত তার অদক্ষতার কারণে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের দ্বৈন্যদশা কাটছে না। তদবির করেই হাল আমলেও তার প্রভাব কমে নাই। অদৃশ্য ছুতার ইশারায় সহকারী পরিচালক জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের অনিয়ম দুর্নীতি অব্যবস্থাপনার জন্য অনেকাংশেই দায়ী বলে হাসপাতালে আগত রোগীরা মনে করছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category