• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২২ অপরাহ্ন

সরিষাবাড়ীতে যমুনার ভাঙনে গ্রামের মানুষ চরম আতঙ্কে

স্টাফ রিপোর্টার / ১০৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

খেত-খোলা এভাবে ভেঙে গেলে আমরা কীভাবে খাব? আমাদের তো খাওয়ার কিছু নেই। আমরা আপনাদের কাছে কোনো সাহায্য চাই না। শুধু নদীটা যদি বাঁধাইয়া দিত, বাড়িঘরটুকু যদি টিকত, তাহলে কোনো মতে বেঁচে থাকতাম। শেষ সম্বলটুকু ভেঙে গেলে যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই আমাদের

কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা ইউনিয়নের নলসন্ধা গ্রামের বাসিন্দা ছালেহা বেগম। চোখের সামনে কৃষিজমির শেষ অংশটুকু যমুনার গর্ভে বিলীন হতে দেখে তার চোখের জল যেন মিশে যায় উত্তাল নদীর স্রোতে।

ছালেহা বেগমের এই আর্তনাদ শুধু তার একার নয়; এটি যমুনাপাড়ের নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো শত শত পরিবারের দীর্ঘদিনের বেদনার প্রতিচ্ছবি।

বর্ষার শুরুতেই যমুনার তীব্র ভাঙনে সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা ইউনিয়নের নলসন্ধা, ডাকাতিয়ামেন্দা, মিরকুটিয়াসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। গত ১৫ দিনের টানা ভাঙনে দুই শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই নদী গ্রাস করছে কৃষিজমি, বসতভিটা এবং মানুষের আজীবনের সঞ্চয়।

নদীভাঙন বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। কিন্তু প্রতিবার একটি পরিবার যখন মাথা গোঁজার ঠাঁই কিংবা জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারায়, তখন তাদের পুরো জীবনটাই ওলটপালট হয়ে যায়। ছালেহা বেগমও জীবনে একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। প্রতিবারই নতুন করে ঘর বেঁধে বাঁচার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এবারের ভাঙন তাকে ঠেলে দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

একই গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব করিম মন্ডল নদীর পাড়ে নির্বাক হয়ে বসেছিলেন। ফসলের শেষ জমিটুকুও নদীতে বিলীন হওয়ার পর জড়িয়ে আসা কণ্ঠে তিনি বলেন, বাপ-দাদার আমলের জমি তো অনেক আগেই নদী খাইয়া ফেলছে। নিজের কষ্টের টাকায় যা জমি করছিলাম, সেটাও এখন ভাঙনের শেষ সীমানায়। এই বয়সে বউ-বাচ্চা লইয়া কই যামু গো বাবা? শুনছি তারেক সরকার অনেক দয়ালু। আমাগো দিকে যদি একটু নজর দিত, তাহলে ভাঙা বাড়িটাতেই শেষ জীবনটা কোনো মতে কাটাইতে পারতাম।

একই গ্রামের শাহানাজ বেগম জানান, মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে তার দুই বিঘা জমির পাটসহ সবকিছু নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমার দুই মেয়ে আর এক ছেলে। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। অনেক কষ্ট করে জমিটুকু আবাদ করেছিলাম। সেটাও শেষ হয়ে গেল। এখন সন্তানদের মুখে ভাত তুলে দেব কীভাবে, কোনো দিশা পাইতাছি না।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এসব স্থাপনাও যেকোনো সময় যমুনার গর্ভে বিলীন হতে পারে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপ সিংহ জানান, উপজেলার চরাঞ্চলে বর্তমানে পাট, তিলসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ রয়েছে। তবে গত এক সপ্তাহে পিংনা ইউনিয়নের নলসন্ধা এলাকায় যমুনার ভাঙনে প্রায় ৮ হেক্টর পাট, ১৪ হেক্টর তিল এবং বিভিন্ন ধরনের সবজিক্ষেত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা আফসানা বলেন, ভাঙনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা নকিবুজ্জামান খান জানান, পিংনা ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা ইতোমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমানে নদীতে প্রবল স্রোত থাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষা কাজ সম্ভব হচ্ছে না। তবে পুরো এলাকা সমীক্ষা করে স্থায়ী নদীশাসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

যমুনার ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে সরিষাবাড়ীর শত শত পরিবারের। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা এবং মানুষের শেষ সম্বল। ক্ষতিগ্রস্তদের একটাই দাবি অস্থায়ী আশ্বাস নয়, যমুনার ভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে না হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category