সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে দলীয় এই সিদ্ধান্তের পর তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দল থেকে বহিষ্কার হলেই কোনো সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয় না।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্যকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। ভিডিও প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা শুরু হলে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং পরিবারের সম্মতিতেই তাদের বিয়ে হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও অনুমতি ছাড়া ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তুলেছেন।
তবে ওই বিয়ের কাবিননামা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও তারিখ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা চলার মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে।
বুধবার (২২ জুলাই) দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ হারানো; দুটি আলাদা বিষয় বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো দল তার সদস্যকে বহিষ্কার করলেও সংবিধানের নির্ধারিত কারণ ছাড়া একজন সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সংসদ সদস্য নিজে পদত্যাগ করলে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে সংসদে ভোট দিলে বা কোনো ফৌজদারি মামলায় আদালতের রায়ে নির্দিষ্ট ধরনের সাজা হলে তার পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে নৈতিক স্খলন বিষয়টি প্রমাণের জন্য আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য পদ বাতিল করার সুযোগ নেই বলে তারা মনে করছেন।
সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ হারানো দুটি আলাদা বিষয়। জামায়াতে ইসলামী তাকে বহিষ্কার করলেও তার এমপি পদ বহাল থাকবে।
তিনি বলেন, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অভিযোগ সংসদের তদন্ত কমিটিতে প্রমাণিত হলে তার পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ জন্য সংসদীয় তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে।সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, সাধারণত দলের নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করলে কোনো সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে শুধু বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না।
তিনি বলেন, কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে সংসদে ভোট দিলে, নিজে পদত্যাগ করলে অথবা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পেলে পদ হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ বিষয়টি নিয়ে আইনে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে উল্লেখ করে শাহদীন মালিক বলেন, সব অপরাধের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। কোন অপরাধ নৈতিক স্খলনের আওতায় পড়বে, তা নির্ভর করে আইনি ব্যাখ্যা ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা তুলে ধরে দাবি করেছেন, দল থেকে ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগে বহিষ্কার হওয়া একজন সংসদ সদস্যের পদে বহাল থাকার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তিনি জানান, এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করবে।
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দিচ্ছে। কারণ ‘নৈতিক স্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।
এদিকে, গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ওই তরুণী তার বৈধ স্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে। ওই তরুণীও নিজেকে গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী দাবি করে জানিয়েছেন, তাদের বিয়ে পারিবারিক সম্মতিতে হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
তবে বিয়ের কাগজপত্র ও নিবন্ধন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের কারণে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ ও প্রচারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।